festival

যুদ্ধংদেহী, উন্মত্ত কালী রূপের পিছনের রহস্য কি – পড়ুন

ফোকাস বেঙ্গল ওয়েব ডেস্ক: হিন্দু শাস্ত্রে বলা রয়েছে, তন্ত্র মতে যে সব দেব-দেবীদের পূজো করা হয়, তাঁদের মধ্যে কালী পুজো অন্যতম। শক্তির দেবী হিসেবে শ্যামা বা কালীমূর্তির আরাধনা করেন শাক্ত বাঙালিরা। বলা হয়, যাঁরা সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করতে চান, তাঁরা তন্ত্র-মন্ত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসী। শক্তির আরাধ্য দেবী কালীর উগ্র ও ভয়ংকর রূপ সৃষ্টির পেছনে আছে পৌরাণিক কারণ। ভারতে কালীপুজোর উত্‍পত্তি বিকাশ এবং প্রচলন প্রথা সম্পর্কে নানান তথ্য চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। সেই সকল তথ্য কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা নিয়ে নানান মতভেদ রয়েছে। অতীত ঘাঁটলে তার উত্‍পত্তি সম্পর্কে নানান তথ্য আমরা পেয়ে থাকি।

কালী মায়ের রূপের বর্ণনা – আমরা সাধারণত কালীর যে রূপের দর্শন পাই, তিনি চতুর্ভূজা অর্থাত্‍ তার চারটি হাতযুক্ত মূর্তি। খড়গ, অন্যটিতে অসুর মুণ্ড অন্য হাতগুলিতে তিনি বর এবং অভয় প্রদান করেন। গলায় নরমুণ্ডের মালা, প্রতিকৃতি ঘন কালো বর্ণের এবং রক্তবর্ণ জিভ মুখ থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে । এছাড়াও তিনি এলোকেশি। মা কালীকে দেখা যায় শিবের বুকের উপর পা দিয়ে জিভ বার করে দাঁড়িয়ে আছেন।

কালী পূজার কালী শব্দটি কাল শব্দের স্ত্রীর রূপ, যার অর্থ হল কৃষ্ণ বর্ণ বা গুরু বর্ণ। বিভিন্ন পুরাণ থেকে থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহামায়া মা দুর্গার অন্য একটি রূপ হল কালী। প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কালী একটি দানবীর রূপ। মহাভারতে কালীর উল্লেখ রয়েছে, সেখানে যোদ্ধা এবং পশুদের আত্মা বহন করেন যিনি, সেই তিনিই কাল রাত্রি অর্থাৎ কালী নামে পরিচিত।

দুর্গার আরাধনার পর কালী পুজোর পালা আসে। গৌরী এবার শ্যামবর্ণা হয়ে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন কালী রূপে। কিন্তু কেন হিমালয় কন্যা গৌরী কালী হলেন? এই প্রসঙ্গে বহু মত প্রচলিত। একটি মত অনুসারে বলা হয়, কালকে ধারণ করে আছেন বলেই দেবী কালী। উৎপত্তি, স্থিতি ও মহাপ্রলয়ের পেছনে কাজ করে এই কাল শক্তি। যে কাল সমস্ত কিছুকে গ্রাস করে সেই কালকেই গ্রাস করেন বলেই দেবী কালী। মহা প্রলয়ের কাল শক্তি মহাকালীর ভেতরেই অন্তর্হিত হয়ে যায়।

আরেকটি মত অনুসারে বলা হয় যে, দেবী আসলে শ্যামবর্ণা নন তিনি অত্যন্ত উজ্জ্বলবর্ণা। কিন্তু তার সেই ঔজ্জ্বল্য এতটাই প্রখর যে আমাদের চর্ম চোখে তা দেখা যায় না, তাই সেই উজ্জ্বলতাকে আমরা এই ক্ষুদ্র চোখে দেখতেই পাই না। যেমনভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রখর উজ্জ্বল তেজ অর্জুন দিব্য দৃষ্টি দিয়েও দেখতে পাচ্ছিলেন না, ঠিক তেমনি কালীও উজ্জ্বল, কিন্তু আমরা তাকে শ্যামবর্ণা দেখি।

মা কালীর আবির্ভাব মুহূর্ত সম্পর্কে বলা হয় যে মা‌ দুর্গার ভ্রু যুগলের মাঝখান থেকেই দেবী কালিকা আবির্ভূতা হোন। স্বর্গ যখন অসুর শক্তি দখল করে নিয়েছে তখন দেবতারা প্রাণভয়ে ভীত হয়ে মহামায়ার আশ্রয় নিলেন। দেবী মহামায়া দুর্গা তখন অবতীর্ণ হলেন যুদ্ধে। অসুরদের প্রধান রক্তবীজকে বধ করবার সময় দেবী দুর্গা দেখেন যে তার পক্ষে বধ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ সে ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত হওয়ায় তার শরীরের এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেও তা থেকে একাধিক অসুরের জন্ম হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে দেবী দুর্গা অত্যন্ত রেগে যান। তখন তার ভ্রুযুগলের মাঝখান থেকে আবির্ভূত হন দেবী কালী। তিনি রুদ্র মূর্তি ধারণ করে অসুর বধ করতে থাকেন। রক্তবীজকে বধ করবার সময় এতটাই উন্মত্ত ছিলেন যে এক হাতে অসুর বধ করছিলেন এবং জিভ দিয়ে তাদের শরীরের রক্ত পান করছিলেন। এইভাবেই বিনাশ সাধন সম্ভব হয় রক্তবীজের। এইসময়  দেবী সকল অসুরদের বধ করতে করতে বিজয় উল্লাসে প্রবল তাণ্ডব নৃত্য করতে শুরু করেন।

ক্রোধে উন্মত্ত দেবী অসুরদের ধড়হীন মুন্ড দিয়ে বানাচ্ছিলেন নিজের কোমর বন্ধ আর গলার মালা। দেবীর হুংকার ও তাণ্ডবে ত্রিভুবন কেঁপে উঠছিল। দেবীকে না থামালে প্রলয় আসন্ন বুঝতে পেরে স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব দেবীর যাত্রাপথের মাঝখানে শুয়ে পড়েন। দেবী কালী মৃতদেহ ভেবে স্বামীর বুকে পা রাখেন। কিন্তু এরপর তিনি যখন দেখেন যে আসলে তিনি তার স্বামীর বুকে পা রেখেছেন তখন তিনি লজ্জায় নিজের জিভ বার করে ফেলেন ও নিজের জিভ কেটে ফেলেন আর এইরূপে তিনি ত্রিভূবনে‌ পূজিতা হন।